নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ | ১০ মার্চ, ২০২৬ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (এনসিসি) বিদ্যুৎ শাখার সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) রেজাউল ইসলাম রাজুর বিরুদ্ধে চাকুরীর শুরু থেকেই বেপরোয়া দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হেনস্তা—সব মিলিয়ে তার কর্মজীবন যেন অনিয়মের এক মহাকাব্য। ঠিকাদারদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া অনুসন্ধানে জানা যায়, রেজাউল ইসলাম রাজু চাকুরীর শুরু থেকেই অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ ছিলেন। এনসিসির আওতাধীন তিন অঞ্চলের ‘স্মার্ট এলইডি বাতি’ স্থাপন প্রকল্পের কাজ চলাকালীন তিনি তৎকালীন একমাত্র বিদ্যুৎ প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ নিয়ে ঠিকাদারদের ফাইল আটকে দেন।
ফাইল ছাড়ানোর বিনিময়ে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে কয়েক দফায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি জামানতের ফাইল আটকে রেখে তিনি জনৈক ঠিকাদারের কাছে গাড়ি দাবি করেছিলেন বলেও জানা গেছে। সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিতাড়ন রেজাউল ইসলাম রাজুর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বড় অভিযোগ হলো—অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা। বিদ্যুৎ শাখার কোনো দক্ষ প্রকৌশলীকেই তিনি টিকতে দেননি। ছলে-বলে-কৌশলে তাদের বদলি বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছেন। এমনকি তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় সিভিল শাখার প্রকৌশলীরাও তার রোষানল থেকে রেহাই পাননি। ২০২২ সালে প্রকৌশল বিভাগ ঐক্যবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কর্তৃপক্ষ তাকে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে বদলি করে।
ময়মনসিংহেও বজায় ছিল ‘কুকীর্তি’ ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে বদলি হওয়ার পর সেখানেও তিনি তার স্বভাবজাত আচরণ পরিবর্তন করেননি। সেখানকার নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার দায়ে কর্তৃপক্ষ তাকে সংশ্লিষ্ট কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ওএসডি (OSD) করে রাখে। ৫ই আগস্টের পর পুনরায় আধিপত্য ও লুটপাট ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মাধ্যমে লবিং করে তিনি আবারও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে ফিরে আসেন। ফিরে এসেই তিনি পুনরায় লুটপাটে মেতে ওঠেন। ঠিকাদারদের হয়রানি করার পাশাপাশি পদ্ম-২ ভবনসহ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ভবনের ফ্ল্যাট মালিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লিফট মেরামতের নামে ফ্ল্যাট মালিকদের কাছ থেকে তোলা চাঁদাবাজির ঘটনার সাক্ষী খোদ ভুক্তভোগী মালিকরা।
তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত ‘প্রতিহিংসার চিঠি’ দুর্নীতির অভিযোগে কর্তৃপক্ষ রাজুকে বিভিন্ন ভবনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাশেমকে দায়িত্ব প্রদান করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজু অফিস আদেশ অমান্য করে সহকর্মীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে উর্ধ্বতন মহলে চিঠি দেন। তবে তৎকালীন এসই (SE) ও এক্সেন (XEN) মহোদয়ের সরেজমিন তদন্তে রাজুর দেওয়া সকল তথ্য মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়। কাজ না করেই বিল আত্মসাৎ ও চুনকা পাঠাগারে অনিয়ম অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ওয়াসার একটি বৈদ্যুতিক কাজে ৩-৪ লাখ টাকার ডিপিএম (DPM) ফাইল করে কোনো কাজ না করেই ঠিকাদারের মাধ্যমে বিল তুলে আত্মসাৎ করেছেন রাজু।
এছাড়া আলী আহম্মদ চুনকা পাঠাগার নির্মাণকালেও তিনি ঠিকাদারকে নিম্নমানের মালামাল নিতে বাধ্য করেন এবং সাউন্ড সিস্টেম ও সাব-স্টেশন কেনাকাটায় মোটা অঙ্কের টাকা পকেটস্থ করেন। জনপ্রতিনিধির সাথে হাতাহাতি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন রেজাউল ইসলাম রাজুর বেপরোয়া আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায় যখন তিনি নিজ দপ্তরে বসেই একজন তৎকালীন কাউন্সিলরের সাথে হাতাহাতিতে লিপ্ত হন। তার এমন অপেশাদার আচরণ ও ক্রমাগত দুর্নীতির ফলে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সচেতন মহলের দাবি, রেজাউল ইসলাম রাজুর সার্ভিস বুক পর্যালোচনা এবং তার অবৈধ সম্পদের সঠিক তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এমন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বহাল থাকলে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হবে।