জাতীয় নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শক্তি ও পরিপক্বতার প্রতিফলন। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যত স্বচ্ছ ও প্রশ্নমুক্ত হবে, ততই জনগণের আস্থা দৃঢ় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ভোটকেন্দ্রে পাঠানোর প্রচলন দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিতর্কিত ও অবিশ্বাসের মুখে ফেলেছে। এ নিয়ে গতকাল আমার একটি উপ-সম্পাদকীয় প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইতিপূর্বে ভোটের আগের রাতে ভোট কেন্দ্র গুলো চরম ঝুকিপূর্ণাবস্থা আমরা দেখেছি। যেখানে প্রিজাইডিং-পুলিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রশাসনের লোকজন কেন্দ্রের ব্যালট-বাক্স পাহারা দিতে গিয়ে চরম খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন।
কোথাও কেন্দ্র দখল করতে গিয়ে বোমাবাজি-গোলাগুলি-হতাহত- ব্যালট বাক্স ছিনতাই কিংবা অধিকাংশ ব্যালটে রাতেই সিল মারার মত চরম নষ্ট কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে, ভোটাররা সকালে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোট খুঁজে পায়নি। এমনকি মৃত্যু ব্যক্তির ভোটও সেরে ফেলেছিলো। কোনো দেশের জনগনের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারা ঐ রাষ্ট্রের পরবর্তী মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হতে পারার প্রথম সফল উদাহরণ। তবে ভোটাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশে তা দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে অনুপস্থিত এবং ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। কর্তাব্যক্তিদের রাতের ঘুম নষ্ট হবে মনে করে এরা ভোট কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স আগের দিনই কেন্দ্রে পাঠিয়ে নিজেরা ঝামেলা এড়িয়ে যান। অথচ তাদের ছোট্ট একটি ভুল সিদ্ধান্তে গোটা দেশের হাজার হাজার ভোট কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ-ভীতিকর পরিবেশ বানিয়ে ঘুম নষ্ট করলেন লাখো দায়িত্বশীল প্রিজাইডিং, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসারসহ দায়িত্বশীলদের।
ভোটের আগের দিন ব্যালট-বাক্স পাঠালে ভোটের রাতটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি ব্যালট পেপার ও বাক্স ভোটের আগের রাতে গ্রামগঞ্জের ভোটকেন্দ্রে না রেখে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হেফাজতেই থাকে, তবে সেই রাত আর ঝুঁকিপূর্ণ থাকে না, বরং ঝুঁকিমুক্ত হয়। এতে অনিয়মের আশঙ্কা, গুজবের সুযোগ এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ অনেকাংশে কমে যায়। যদি ভোটের দিন সকালে উপজেলা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ব্যালট সামগ্রী কেন্দ্রে পৌঁছানো হলে দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট হয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে ভোটারদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে ভোট শুরুর আগেই তাদের ভোট নিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে আজ বুধবার দুপুরের পর থেকেই বাংলাদেশের সকল উপজেলা থেকে ইউনিয়নের ভোট কেন্দ্র গুলোতে ভোটের সরঞ্জাম সহ ব্যালট পেপার ও বাক্স পাঠানো শুরু হবে।
এগুলো আজ না পাঠিয়ে আগামীকাল ফজরের নামাজ শেষে কেন্দ্র গুলোতে পাঠালে তা সকলের জন্য নিরাপদ ও কল্যাণকর হতো বলে মনে করি। এ দেশের জনগণ আশা করে, রাষ্ট্র যন্ত্রের দীর্ঘদিনের এই পুরানো রুট পরিবর্তন করে নতুন রুটে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এতে বাংলাদেশে দিনের ভোট রাতে এ প্রবাদ বাক্যটি বিলুপ্ত হতে পারে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল ভোট গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভোটের আগের প্রস্তুতিই নির্ধারণ করে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা। মনে রাখা উচিত, প্রশ্নবিদ্ধ প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলই জন্ম দেয়, যার খেসারত দিতে হয় জনগন, রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রকে।
‘যদিও দেশে রাস্তাঘাটের যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে তবে সেই তুলনায় মেধা গুলোর উন্নয়ন ঘটলে দিনের ভোট দিনেই সম্ভব’। দিনের ভোট দিনের আলোতেই হওয়া উচিত। ভোটের দিন সকালে ব্যালট পেপার ও বাক্স কেন্দ্রে পাঠানো একটি নিরাপদ সিদ্ধান্ত বরং এটি নির্বাচনকে ঝুঁকিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনআস্থাভিত্তিক করার একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নির্বাচন কমিশনের উচিত এই বাস্তবতা অনুধাবন করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা প্রশ্ন নয়, আস্থা তৈরি করে।