রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ, আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন কিংবা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সংবাদ কাভারেজের জন্য আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দের রীতি একসময় প্রচলিত ছিল। এই আলাদা টেবিল বা নির্ধারিত জায়গাটিই পরিচিত ছিল ‘প্রেস টেবিল’ নামে। এটি কেবল বসার স্থান নয়, বরং সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় ও নিরাপত্তার একটি স্বীকৃত কাঠামো ছিল। তা এখন সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাটি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আজকের বাস্তবতায় প্রেস টেবিলের অনুপস্থিতি সাংবাদিকতার জন্য একটি নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। অথচ এই প্রেস টেবিল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক।
বর্তমানে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের আয়োজনে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সংবাদকর্মীরা বাধ্য হচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভিড়ে, কখনো মঞ্চের একেবারে পাশে, কখনো বা কর্মীদের ঘাড়ে ঘাড় মিলিয়ে দাঁড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে। এমন পরিস্থিতিতে একজন পেশাদার সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও পড়ে চরম ঝুঁকিতে। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের জন্য এ ধরনের পরিবেশ শুধু বিব্রতকরই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা অবমাননাকর এবং অসহনীয়ও বটে। ঝুঁকির মুখে সাংবাদিকতা: ইতিপূর্বে বহু রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা বিদ্বেষমূলক আচরণ, হেনস্তা এমনকি শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন, এমন নজির নতুন নয়।
দলীয় কর্মীদের সঙ্গে একই সারিতে অবস্থানের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও এমনভাবে ধারণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি স্থিরচিত্র বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও একজন সাংবাদিককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করতে যথেষ্ট। বাস্তবে নিরপেক্ষ থাকলেও এসব বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত সাংবাদিককেই বহন করতে হয়। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী না হয়েও শুধুমাত্র কোনো একটি ফ্রেমে বা ভিডিওতে উপস্থিত থাকার কারণে বহু সাংবাদিক হামলা, মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়া একজন সাংবাদিকের জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যও অশনিসংকেত। প্রেস টেবিল থাকলে এ বিপর্যয় এড়ানো যেত:রাজনৈতিক দলগুলোর আয়োজনে যদি গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘প্রেস টেবিল’ বা আলাদা মিডিয়া জোন রাখা হতো, তবে সাংবাদিকদের এমন করুণ পরিণতির মুখোমুখি হতে হতো না। এতে একদিকে যেমন সংবাদ সংগ্রহ হতো সহজ, সুশৃঙ্খল ও পেশাদার পরিবেশে, অন্যদিকে সাংবাদিকদের দলীয় পরিচয়ের অপবাদ থেকেও মুক্ত রাখা যেত।
প্রেস টেবিল সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর পেশাদার দূরত্ব তৈরি করে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত জরুরি। এই দূরত্ব সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সাহস জোগায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও গণমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকিও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এখনো বেঁচে আছে:এখনো দেশে বহু দল নিরপেক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন, যারা কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা সহযোগী শক্তি না হয়েও সততা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে রাজনৈতিক দলের আয়োজনে এই অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও অসচেতনতা চরম হতাশাজনক এবং অসহনীয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ; গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ কিংবা সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। সাংবাদিকরা কোনো দলের মুখপাত্র নন, আবার শত্রুও নন। তারা সমাজের দর্পণ—যেখানে ভালো-মন্দ উভয় চিত্রই প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ: আমরা আশা করবো, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এ বিষয়টি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যতে সকল রাজনৈতিক আয়োজনে গণমাধ্যমের জন্য আলাদা প্রেস টেবিল বা নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করবেন।
এটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি একটি সুস্থ, সহনশীল ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে। সবশেষ কথা, প্রেস টেবিল কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সাংবাদিকতার ন্যূনতম অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা মানেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। লেখক: আহমেদ আবু জাফর সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ও চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, ০১৭১২৩০৬৫০১, জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:।