মোঃ আবু কাওছার মিঠু রূপগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ বাণিজ্য মেলায় কম দামে দৃষ্টিনন্দন পাটজাত পণ্যের বাহারি সমাহার ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে। চাহিদাও প্রচুর। দৃষ্টিনন্দন বুনন শৈলীতে নগর জীবনে জায়গা করে নিচ্ছে পাট পণ্য। কার্পেট, ব্যাগ, শতরঞ্জি, পর্দা, গয়নার বাক্স, শোপিসের পাশাপাশি পাট দিয়ে তৈরি হচ্ছে পর্দা, ফুলদানি, চেয়ার, কুশন কাভারসহ ঘর সাজানোর নানা উপকরণও। আবহমান বাংলা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে তৈরি সোনালি আঁশ পাটের এসব পণ্য দর্শকের দৃষ্টি কাড়ছে। ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে পাটের তৈরি এসব পণ্য। যেমন পছন্দ তেমন বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। পাটের তৈরি এসব পণ্যের চাহিদা বেশি। দামও কম। ক্রেতারাও ভালো মানের ও টেকসই পাটের তৈরি সামগ্রী ক্রয়ে ঝুঁকছেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসির) প্যাভিলিয়নে ২০টি স্টল রয়েছে।
টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও সবুজ উন্নয়নের লক্ষ্যে পাটের পণ্য ব্যবহারে ঝুঁকছে মানুষ। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পাট শিল্পের এসব স্টলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় জমে। তবে বিকাল থেকে জমজমাট হয়ে উঠে এসব স্টল। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাণিজ্য মেলার পিছনের দিকের জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসির) প্যাভিলিয়নে পাটজাত পণ্যের স্টলগুলোতে জুট পর্দা, লেডিস পার্স, ল্যাপটপ ব্যাগ, টিফিন ব্যাগ, টিস্যুবক্স, বাঁশের তৈরি টুথব্রাশ, শো-পিস, নার্সারি পট, অফিস ব্যাগ, রাইস ম্যাট, টেবিল কভার, টেবিল ম্যাট, ক্যাপ, ফ্লোর ম্যাট, লেডিস ব্যাগ, জুট অর্নামেন্ট, রুম ম্যাট, ফ্রুট বক্স, ট্রাভেল ব্যাগ, ওয়াল ম্যাট, অফিস ব্যাগ, রিং প্লান্টার, বেডশিট, স্কুল-কলেজ ব্যাগ, স্যান্ডেল, অফিস ফোল্ডার, কলমদানি, ভ্যানিটি ব্যাগ, লেডিস বটুয়া, ফেব্রিক্স, ঢোল ব্যাগ, টি ম্যাটসহ ৬০ থেকে ৭৫ ধরণের পাটের তৈরি পণ্য স্থান পেয়েছে।
১২০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মূল্যের পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা বেশি। তবে বেশি দামের পণ্যের চাহিদা কম। নারকেলের ছোবা, পাখির বাসা, বাঁশের আসবাবপত্রসহ পাটের সুতা, ব্যাগ, হোগলা পাতার সংমিশ্রণে তৈরি করা পণ্যও স্টলে স্থান পেয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণে পাট পণ্য তৈরি করা হয়। তাতে পাটের তৈরি পণ্যেরও ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসির) প্যাভিলিয়নে জুট ব্র্যান্ড, ক্রিয়েটিভ জুট টেক্সটাইল প্রোডাক্টস, রূপালী কুটির শিল্প, বেকি সেন্টার, ফাইন ফেয়ার ক্রাফটস, ব্যাগ বাজার, হ্যান্ডি ক্রাফটস অ্যান্ড ফ্যাশন, রুরাল উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট, বেঙ্গল ব্রেইডেড রাগস লিমিটেড, হেরিটেজ ইকো প্রোডাক্টসহ ২০টি স্টল রয়েছে। মেশিন আর হস্তচালিত তাঁতে এসব পণ্য তৈরি হয়। পাটজাত পণ্যকে দেশে জনপ্রিয় করতে সরকার দেশের কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করেছে বলেও স্টলের মালিকরা জানিয়েছেন।
পাট থেকে বস্তা, শাড়ি, ফ্রেব্রিক, সোফা, হ্যান্ডব্যাগ, কার্পেট, পর্দা, জুতা, শো-পিসসহ শত শত রকমের পণ্য তৈরি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ, আমেরিকায়ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ঢাকার নতুন বাজার থেকে আসা গৃহবধূ অনামিকা দাস বলেন, দৃষ্টিনন্দন পাটজাত পণ্যের বাহারি সমাহারে তিনি মুগ্ধ। হাতের তৈরি পাটের পণ্য দাম কম হওয়ায় কিনেছেন স্কুল ব্যাগ, লেডিস সাইড ব্যাগ। গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থেকে আসা গৃহবধূ নাসিমা সুলতানা বলেন, পাটের তৈরি ঘরের শোভাবর্ধন পণ্য দেখতে সুন্দর, মসৃণ। দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের অংশ হিসেবে পাটের কিছু পণ্য ক্রয় করেছি। মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সিনথিয়া জাহান বলেন, পাট দিয়ে যে এতো বৈচিত্রপণ্য জিনিস তৈরি হয় সেটি তার জানা ছিল না। একটা সময় মনে করা হতো পাট দিয়ে শুধু চটের ব্যাগ তৈরি করা হয়।
কিন্তু সে ধারণা এখন আর নেই। পাট দিয়েই তৈরি হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার সামগ্রী। হ্যান্ডি ক্রাফটস অ্যান্ড ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক হৃদয় হোসেন বলেন, প্রচলিত বয়ন শিল্পে পাটের, সুতা, পাকানো সুতা, বস্তা, চট, কারপেট, ব্যাকিং, পর্দার কাপড়, কুসন কভার পাট থেকে পাটের মিশ্রণ করা হয়। ময়মনসিংহ থেকে আসা রুরাল উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের নারী উদ্যোক্তা আয়েশা হামিদা বলেন, এবারের মেলায় আমাদের তিনশোর কাছাকাছি পাটজাত পণ্যের সমাহার রয়েছে। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় ও রুচিশীল সব কিচেন পণ্য, টেবিল মেট, ব্যাগ সবই মিলছে এখানে। হাউজ ডেকোর আইটেমগুলো ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। ক্রেতা সাধারণের বেশ আগ্রহ রয়েছে পাটপণ্যে। আমরা বেশ সাড়া পাচ্ছি। ব্যাগ বাজার স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি আকলিমা ইসলাম বলেন, পাট বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল। সোনালি আঁশের সমাদৃত বিশ্বব্যাপী।
মাটির গুণাগুণ ও জলবায়ু অনুকূলে থাকায় বাংলাদেশে উন্নতমানের পাট উৎপাদিত হচ্ছে। সেসব পাটেই পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। জুট ব্র্যান্ড স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি জাহানারা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক বাজারের দখলে কৌশলগত ত্রুটি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, অদক্ষ ও বেশি সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগে দিন দিন এ শিল্পে ভাটা পড়েছে। কিন্তু গৃহস্থালির কাজে পাটের তৈরি পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। রূপালী কুটির শিল্পের বিক্রয় প্রতিনিধি মাছুম আহম্মেদ বলেন, পাট ও তুলার মিশ্রণে তৈরি ব্যাগ রপ্তানি করা হচ্ছে। পাট দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, খেলনা, বাহারি ব্যাগ, শো-পিস, ওয়াল ম্যাট, পাপোস, জুতা, স্যান্ডেল, শিকা, দড়ি, সুতলি, দরজা-জানালার পর্দার কাপড়, গহনা ও টিস্যুবক্সসহ -২৮৫ ধরণের পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। মেলায় পাটের তৈরি ৬০/৭৫ ধরণের পণ্য স্থান পেয়েছে।
জারিফ এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় প্রতিনিধি কাউসার হোসেন বলেন, পাট ও পাটপণ্য সামগ্রী বহুমুখীকরণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করছে জেডিপিসি। এখানে স্টল নেওয়া মূলত সে কারণেই। মেলায় বেশ সাড়া পাচ্ছি। জেডিপিসির ম্যানেজার (অপারেশন) জাফর সাদেক বলেন, পলিথিনের ভয়াবহতায় আজ পরিবেশ বিপর্যস্ত। সরকার পলিথিন বন্ধে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। পাটপণ্য দেশসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হলে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি এগিয়ে আসতে হবে। এসব পণ্য ব্যবহারের পর তা ফেলে দিলে পচে যাবে। এটা পরিবেশবান্ধব। পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটপণ্য ছড়িয়ে দিতে এক হাজার ১০০ তালিকাভুক্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, তার মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক এখানে মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য আনা হয়েছে। আমাদের ২৮৮টি পাটপণ্য মেলায় আনা হয়েছে।